Skip to main content

সত্য, ত্রেতা, দ্বাপর, কলি - চার যুগের অনন্তকালীন সৃষ্টি-ধ্বংসের ধারণার যৌক্তিক খণ্ডন



ভারতীয় পৌত্তলিকতায় সৃষ্টির কোনো নির্দিষ্ট প্রারম্ভ নেই বলে দাবি করা হয়, যেখানে সৃষ্টি ও ধ্বংস ক্রমাগত চক্রাকারে চলতেই থাকে। কিন্তু পৌত্তলিকগণ তাদের এই অনন্তকালীন সৃষ্টি-ধ্বংসের ধারণার দ্বারা যৌক্তিকভাবে সৃষ্টির চূড়ান্ত প্রারম্ভ (very beginning of the creation) এর বিষয়টি এড়িয়ে যেতে পারবে না। এর কারণ, সৃষ্টি-ধ্বংস অনন্তকাল ধরে চলমান - এর অর্থ হল, মানুষের পক্ষে এর চূড়ান্ত প্রারম্ভ নির্ণয় করা সম্ভব নয়; কিন্তু যৌক্তিক বিবেচনায়, সৃষ্টি-ধ্বংসের ক্রমাগত চক্র আছে মানে হল, এই চক্রেরও একখানা চূড়ান্ত প্রারম্ভ থাকবে।

যেমন, ভাগবতের ভাষায়, সৃষ্টি-ধ্বংস সত্য, ত্রেতা, দ্বাপর, কলি-তে বিভক্ত হলে, বার বার এই চার যুগের আগমনের ধারণা থেকে যৌক্তিক সিদ্ধান্ত এটা নেওয়া যায় যে, কোনো না কোনো সময়ে সর্বপ্রথম এই চার যুগের চক্র শুরু হয়েছিল। অর্থাৎ সর্বপ্রথম সত্য যুগের একটি চূড়ান্ত প্রারম্ভ হয়েছিল আর তারপরই পরপর সৃষ্টি-ধ্বংসের চক্র চলমান হয়েছে। কিন্তু যদি তাদের সামান্য এই প্রশ্নটাই করা হয় যে, চূড়ান্তভাবে প্রথম সৃষ্টি কখন হয়েছিল, তারা তাদের পূর্বপুরুষদের থেকে প্রাপ্ত শিক্ষা অনুযায়ী অন্ধভাবে বলতে থাকবে যে, সৃষ্টির কোনো চূড়ান্ত শুরু নেই, এটা অনন্তকাল ধরে চলমান!

এথেকে প্রতীয়মান হয় যে, যৌক্তিক বিচারে, যে সৃষ্টির চূড়ান্ত প্রারম্ভ আছে, সেই সৃষ্টির চূড়ান্ত প্রারম্ভ সম্পর্কে হয় কোনো প্রকৃত জ্ঞান তাদের কাছে নেই, নয়ত কোনো জ্ঞান সৃষ্টিকর্তার পক্ষ থেকে পূর্বে তাদের কাছে এসে থাকলে, তারা নিজেদের স্বার্থ সিদ্ধির জন্য সেটাকে বিকৃত করতে করতে তা আজ হারিয়ে ফেলেছে। আর তাই বর্তমানে তারা কিছু মনগড়া দর্শন আর তত্ত্ব বের করেছে সৃষ্টিকে ব্যাখ্যা করার জন্য।

فَوَیۡلٌ لِّلَّذِیۡنَ یَکۡتُبُوۡنَ الۡکِتٰبَ بِاَیۡدِیۡہِمۡ ٭ ثُمَّ یَقُوۡلُوۡنَ ہٰذَا مِنۡ عِنۡدِ اللّٰہِ  لِیَشۡتَرُوۡا بِہٖ ثَمَنًا قَلِیۡلًا ؕ فَوَیۡلٌ لَّہُمۡ  مِّمَّا کَتَبَتۡ اَیۡدِیۡہِمۡ وَ وَیۡلٌ لَّہُمۡ مِّمَّا یَکۡسِبُوۡنَ ﴿۷۹﴾
"সুতরাং অভিসম্পাত তাদের জন্য যারা নিজ হাতে কিতাব রচনা করে এবং নিকৃষ্ট মূল্য লাভের জন্য বলে এটা আল্লাহর নিকট হতে, তাদের হাত যা রচনা করেছে তার জন্য তাদের শাস্তি অবধারিত এবং তারা যা উপার্জন করে তার জন্যও শাস্তি রয়েছে।" (আল-কোরআন ২:৭৯)

অবৈদিক এ্যাব্রাহামিক একেশ্বরবাদ এখানে ঘোষণা করছে যে, এই জ্ঞান স্রষ্টা প্রদত্ত যে, সৃষ্টির চূড়ান্ত প্রারম্ভ হয়েছিল এবং ছয়টি দীর্ঘ দিবসে গোটা সৃষ্টিকার্য সম্পন্ন হয়, "তিনিই আসমানসমূহ ও যমীন সৃষ্টি করেছেন ছয়টি দিবসে..." (আল-কোরআন ১১:৭)
অর্থাৎ গোটা সৃষ্টির অস্তিত্বে আসার সময়কালকে ছয়টি ভাগে বিভক্ত হওয়ার নিদর্শন দেখানো হয়েছে।

আধুনিক বিজ্ঞানের ভাষাতেও ছয়টি ভাগে কোথাও কোথাও সৃষ্টির এই সময়কালকে ভাগ করা হয়েছে। যেমন, National Geographic Magazine, February 1982 (Vol. 161, No. 2) এ সৃষ্টির সময়কালকে এই ছয় ভাগে ভাগ করা হয়েছে - 1)Plank time 2)Inflationary 3)Formation of proton & neutron 4)Formation of nucleus 5)Formation of matter & separation of radiation 6)Familiar universe. তবে এখানে এই ভাগগুলোকেই আমরা চূড়ান্তভাবে গ্রহণ করছি না। কেননা এই ভাগগুলোকে আরও ভাগে ভাগ করা যেতে পারে। এর পাশাপাশি, এই ভাগ কেবল দৃশ্যমান মহাবিশ্বের সাপেক্ষে সময়ের আনুমানিক গণনা, আর সৃষ্টিতে এখনও বহু বিষয় রয়েছে যে সম্পর্কে সঠিকভাবে জানা পর্যন্ত সম্ভব হয়নি। এক্ষেত্রে এটা কেবল একটি তুলনামূলক উপস্থাপনা (বিশেষভাবে) নাস্তিকগণের উদ্দেশ্যে।

তবে যাই হোক, এখানে এই ভাগাভাগি তুলে ধরা আসল উদ্দেশ্য নয়। বক্তব্যের আসল উদ্দেশ্য হল, Abrahamic Monotheism (তথা ইসলাম) বলছে যে, সৃষ্টির একটি চূড়ান্ত শুরু রয়েছে যেটা সবচেয়ে যৌক্তিক। প্রাচীনকালের নাস্তিকগণ দর্শনে বেশি প্রভাবিত থাকার কারণে সৃষ্টিকে অনন্ত-অসীম মনে করত। কিন্তু আধুনিক বিজ্ঞানের প্রভাবে নাস্তিকগণও এখন এই ধারণায় বিশ্বাস করা শুরু করেছে যে, সৃষ্টির একটি চূড়ান্ত সূচনা রয়েছে। আর চারপাশের বিষয়ের ওপর গবেষণা তথা empirical analysis চালালে স্বাভাবিকভাবেই আমরা দেখতে পাই যে, সৃষ্টির মধ্যেই কোনো জিনিস তৈরি হলে তা এক সময় আবার নষ্টও হয়ে যায় [প্রত্যেক প্রাণীই মৃত্যুর স্বাদ গ্রহণ করবে (নাস্তিকদের খণ্ডন) - http://bit.ly/2EYUSHF এই লিঙ্কে ভিজিট করুন]। সেক্ষেত্রে এই সিদ্ধান্তের বিচারে মহাবিশ্বেরও যদি একটি চূড়ান্ত সূচনা থাকে, তবে এই মহাবিশ্বের স্থায়িত্বও এক নির্দিষ্ট কাল পর্যন্ত হওয়া কি যৌক্তিক নয়?

তবে মহাবিশ্ব যদি অনন্তকালীন হত, অর্থাৎ তার চূড়ান্ত সূচনা স্বীকার না করা হত, যেমনটা পৌত্তলিকতায় দাবি করা হয়, তাহলে মহাবিশ্বের চূড়ান্ত ধ্বংসের প্রসঙ্গ আসত না। কিন্তু আমরা একেবারে প্রথমেই যৌক্তিক বিবেচনায় দেখানোর চেষ্টা করেছি যে, সৃষ্টি-ধ্বংসের চক্র ধরলেও তার চূড়ান্ত প্রারম্ভ থাকাটাই যৌক্তিক; সেক্ষেত্রে যে মহাবিশ্বের মধ্যেই কোনো একটা জিনিস তৈরির পর নির্দিষ্ট সময় পর তা আমরা ধ্বংস হতে দেখি, সেই মহাবিশ্বেরই চূড়ান্ত সূচনা থাকলে কেন তার চূড়ান্ত ধ্বংস থাকবে না? আর চূড়ান্ত ধ্বংস যদি থেকে থাকে, তবে কেনই বা বার বার সৃষ্টি-ধ্বংসের চক্রের প্রসঙ্গ আসবে? Abrahamic Monotheism-এ এই চূড়ান্ত ধ্বংসের কালকে বলা হয়েছে Doomsday বা Qiyamah (কিয়ামত)।

یٰۤاَیُّہَا النَّاسُ اتَّقُوۡا رَبَّکُمۡ ۚ اِنَّ  زَلۡزَلَۃَ  السَّاعَۃِ  شَیۡءٌ  عَظِیۡمٌ ﴿۱﴾
یَوۡمَ تَرَوۡنَہَا تَذۡہَلُ کُلُّ مُرۡضِعَۃٍ عَمَّاۤ اَرۡضَعَتۡ وَ تَضَعُ کُلُّ ذَاتِ حَمۡلٍ حَمۡلَہَا وَ تَرَی النَّاسَ سُکٰرٰی وَ مَا ہُمۡ  بِسُکٰرٰی وَ لٰکِنَّ عَذَابَ اللّٰہِ شَدِیۡدٌ ﴿۲﴾
"হে মানবমন্ডলী! তোমরা ভয় করো তোমাদের প্রতিপালককে; (জেনে রেখ) কিয়ামাতের প্রকম্পন এক ভয়ানক ব্যাপার। যেদিন তোমরা তা প্রত্যক্ষ করবে, সেদিন প্রত্যেক স্তন্যদাত্রী বিস্মৃত হবে তার দুগ্ধ পোষ্য শিশুকে এবং প্রত্যেক গর্ভবতী তার গর্ভপাত করে ফেলবে; আর মানুষকে দেখবে মাতাল সদৃশ, যদিও তারা নেশাগ্রস্ত নয়; বস্তুতঃ আল্লাহর শাস্তি কঠিন।" (আল-কোরআন ২২:১-২)

আধুনিক বিজ্ঞানে মহাবিশ্বের ধ্বংসের অবস্থাকে Big Crunch এর মাধ্যমে ব্যাখ্যা করা হলেও Big Crunch এর ধারণাকে একেবারে চূড়ান্ত বলে মেনে নেওয়ার শতভাগ নিশ্চয়তা নেই; কেননা বৈজ্ঞানিক থিওরির যে বেগতিক হাল, তাতে থিওরি - পর্যবেক্ষণ, ব্যাখ্যা ও যুক্তির ওপর ক্ষণে ক্ষণে বদলায়!
.
.
===============================
- Ahmad Al-Ubaydullaah

Comments

Popular posts from this blog

Permission of Adultery and Fornication in Hinduism - Remaining Part

Read the previous part here: http:// uniqueislamblog.blogspot.com /2017/11/ permission-of-adultery-and-fornication.html ?m=1 => Condemning physical relationship outside marriage: Generally physical relationship outside marriage is condemned in Hindu Philosophy. Bhagabat Gita says, "There are three gates leading to this hell-**lust**, anger, and greed. Every sane man should give these up, for they lead to the degradation of the soul." (Bhagabat Gita, 16:21) ['Bhagabat Gita As It Is' by His Divine Grace A.C. Bhaktivedanta Swami Prabhupada] This verse indicates that lust or desire outside marriage can lead one to hell if it is not maintained properly. It is further mentioned in Yajur Veda, "O God, **cast aside a lover**, **who cohabits with another's wife** ; **a paramour having illicit connection with a domestic woman** ; **an unmarried elder brother suffering from the pangs of passion** ; younger brother who has married before his elder to ...

মানহাজ ও মাযাহাব নিয়ে যত দ্বন্দ্বের জবাব....

[Special thanks to brother Mainuddin Ahmad for providing some important reference] . মানহাজ অর্থ পথ (path) অথবা পদ্ধতিগত বা নিয়মগত বা প্রণালিগত বিদ্যা (Methodology)। মানহাজ বললে তাই তাকে দুই ভাবে ভাবা হয় - ১) সহিহ মানহাজ, ২) ভ্রান্ত বা বাতিল মানহাজ। . সহিহ মানহা...

কৃষ্ণ কি আল্লাহর নবী ছিল?

এই প্রশ্নটা আমাকেও করা হয়েছে সম্ভবত কয়েকবার। কিন্তু প্রশ্নের উত্তরটা বড়ই জটিল। কারণ এর কোনো যথাযথ উত্তর আমাদের জানা নেই। যদি কৃষ্ণের গোপীদের সাথে লীলার কাজকে সত্য বলে...