ইংরেজিতে Meditation এর সঠিক বাংলা অনুবাদ হল "ধ্যান" যা এসেছে সরাসরি হিন্দু দর্শন হতে। হিন্দু দর্শনের নিম্ন পর্যায়ের উপাসনা পদ্ধতি হল সাকার উপাসনা, যার মধ্যে মূর্তিপূজাও অন্তর্ভুক্ত। আপনি মুসলিম হিসেবে ভাল করেই জানেন যে, এটা স্পষ্ট শির্ক! কিন্তু আজকাল তথাকথিত কিছু মুসলিম যারা আসলে কেবল নামে মুসলিম, তারা প্রয়োজনের চেয়ে একটু বেশি মডার্ণনিজম দেখাতে গিয়ে অন্য এক বিশেষ ধরণের শির্কের পথে পা বাড়াচ্ছে (মেডিটেশন এর মাধ্যমে)।
.
হিন্দু দর্শনকে একটু ভালভাবে দেখলেই এটা বোঝা যায়! এটাকে বোঝার জন্য আমি বরাবরের মত গীতার চতুর্থ অধ্যায়ের ৩৫ নং শ্লোকেরই রেফারেন্স দেবোঃ
.
"হে পান্ডব, এইভাবে তত্ত্বজ্ঞান লাভ করে তুমি আর মোহগ্রস্ত হবে না, যখন জানবে সমস্ত জীবই আমার বিভিন্ন অংশ এবং তারা সকলেই আমাতে অবস্থিত এবং তারা সকলেই আমার।"[১]
.
অর্থাৎ, হিন্দু দর্শন অনুযায়ী সবকিছু ব্রহ্ম বা ঈশ্বরের অংশ এবং এই অংশ রূপান্তরিত হয়ে সৃষ্টি হিসেবে অস্তিত্বমান হয়েছে। আমি বিস্তারিত যাচ্ছি না, কিন্তু কেবল মুসলিম ভাই-বোনদের স্মরণ করিয়ে দেই যে, ইসলামিক সহিহ আকিদায় অর্থাৎ আহলে সুন্নাত আল জামাআত এর আকিদায় আল্লাহ তাআলা আরশের উর্ধ্বে রয়েছেন যা স্থান, কাল, সময়ের পরিমাপের আওতাধীন নয় এবং আমরা এ থেকে এই আকিদা পোষণ করতে পারি যে, সৃষ্টি ও স্রষ্টা পৃথক। কোনো কিছুই আল্লাহর অংশ নয়, আর আল্লাহ তাআলাও কোনো সৃষ্টির মধ্যে কখনও প্রবিষ্ট হন না।
.
তবে হিন্দু দর্শনের মুশরিকি আকিদায় সব কিছু ঈশ্বর বা ব্রহ্মের অংশ। একারণে পার্থিব সৃষ্টির (যা সাকার তার ওপর) মনোনিবেশ হল নিম্ন পর্যায়ের উপাসনা, যা আমি আমার আগের বিভিন্ন লেখাতে আরও বিশদে বলেছি। এই নিম্ন স্তর থেকে উর্ধ্বে যেতে যেতে হিন্দু দর্শন নিরাকার ঈশ্বরের ধারণা দেয়, যেটা আরেকটি কুফরি আকিদা! আর সর্বোচ্চ স্তর হল মোক্ষলাভ, যখন ব্যক্তি বুঝতে পারে এবং মন থেকে অনুভব করতে পারে যে, সে আসলে ঈশ্বর বা ব্রহ্মের অংশ। যখন সে (শয়তানের প্ররোচনায়) নিজেকে আর কোনো পৃথক অস্তিত্ব হিসেবে অনুভব করতে পারে না এবং সবকিছুকে এক হিসেবে দেখে; পৃথক জগৎ না দেখে সব কিছুই ব্রহ্ম বা ঈশ্বর হিসেবে অনুভব করে। তখন সেই পর্যায়কে নির্বিকল্প সমাধি বলে এবং এই স্তরে গিয়ে নিষ্কাম কর্ম (কামনা বিহীন কর্ম) এর মাধ্যমে ব্যক্তি মোক্ষ বা জগতের জন্ম-মৃত্যুর চক্র থেকে মুক্তি লাভ করে বলে ধরা হয়।
.
তাহলে এখানে দেখাই যাচ্ছে যে, মেডিটেশন আর কিছুই না, এই নিরাকার ব্রহ্মের ওপর মনোনিবেশ করা। বেদান্তবাদী বা মায়াবাদীরা বলে যে, এই জগৎ হল মিথ্যা। তাই মেডিটেশনে তারা যেকোনো একটি বিষয়ের ওপর মনোনিবেশ করতে বলে এবং তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, যেহেতু এই জগৎ মিথ্যা এবং একমাত্র ব্রহ্মই সত্য, তাই সে যে জিনিসের ওপর মনোনিবেশ করছে, সেটাও কাল্পনিক। আর তারপর মেডিটেশন বা ধ্যানের মাধ্যমে তার অবচেতন মন উন্নত হতে থাকে এবং তাদেরই ভাষ্য অনুযায়ী, স্মৃতিশক্তি, মনোযোগ প্রভৃতি বৃদ্ধি পেতে শুরু করে ইত্যাদি ইত্যাদি।
.
এখানে আপনি তাহলে সেকুলার, মডার্ণ হতে গিয়ে সেই কুফরি মার্কা আকিদাকেই পুনরায় বরণ করছেন। নিজের অজান্তেই কাল্পনিক ব্রহ্মের ওপর মনোযোগ দেওয়ার পথ অবলম্বন করছেন যার (ব্রহ্মের) কোনো বাস্তব অস্তিত্বই নেই! আর ব্রহ্মের ওপর মনোযোগের পথে চলতে গিয়ে পরোক্ষভাবে বাস্তব জগতকেই আবার মিথ্যা বলে ঘোষণা দিচ্ছেন! উপরন্তু ধ্যান বা মেডিটেশন করতে গিয়ে আপনি ব্রহ্মতত্ত্ব মেনে নিয়ে এটা সাক্ষ্য দিচ্ছেন যে, আপনি আসলে ঈশ্বরের অংশ! এর চেয়ে বড় শির্ক আর কী হতে পারে!!!
.
.
আল্লাহর রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) এই শির্ক-কুফরের ধারণাকে যেমন প্রতিবাদ করেছেন, তেমনি তিনি এটাও জানতেন যে, আখেরি জামানার দিকে যতই মানুষ এগোতে থাকবে, ততই মুসলিম উম্মাহর মধ্যে এহেন জাহেলিয়াতের শির্ক-কুফর যুক্ত চর্চা পুনরায় অনুসৃত হতে শুরু করবে!
.
হাদিসে উল্লেখ করা হচ্ছেঃ
.
"আবু ওয়াক্বেদ আল-লাইষী বলেন, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর সাথে আমরা হুনাইনের পথে বের হলাম। তখন আমরা কুফরের নিকটবর্তী (সদ্য নও-মুসলিম) ছিলাম। মক্কা-বিজয়ের দিন মুসলমান হয়েছিলাম।
.
**(পথে) মুশরিকদের একটি কুল গাছ ছিল; যার নিকটে ওরা ধ্যানমগ্ন হত** এবং (বর্কতের আশায়) তাদের অস্ত্র-শস্ত্রকে তাতে ঝুলিয়ে রাখত; যাকে ‘যা-তে আনওয়াত্ব’ বলা হত।
.
সুতরাং একদা আমরা এক কুল গাছের পাশ দিয়ে অতিক্রম করলাম। (তা দেখে) আমরা বললাম, ‘হে আল্লাহর রসূল! আমাদের জন্য একটি ‘যা-তে আনওয়াত্ব’ ক’রে দিন যেমন ওদের রয়েছে। (তা শুনে) তিনি বললেন, ‘আল্লাহু আকবার! এটাই তো পথরাজি! যার হাতে আমার জীবন আছে তাঁর কসম! তোমরা সেই কথাই বললে, যে কথা বানী ইস্রাঈল মূসাকে বলেছিল, ‘আমাদের জন্য একটা দেবতা গড়ে দিন, যেমন ওদের অনেক দেবতা রয়েছে!’ মূসা বলেছিলেন, ‘তোমরা মূর্খ জাতি।’
.
**অবশ্যই তোমরা একটা একটা ক’রে তোমাদের পূর্ববর্তী (জাতির) পথ অনুসরণ করবে।’’**[২]
.
.
এখানে আরও কয়েকটি বিষয় পরিষ্কার হওয়া জরুরি।
.
মেডিটেশনে আপনি মনে করছেন, আপনার অবচেতন মন উন্নত হচ্ছে, মনোযোগ বৃদ্ধি পাচ্ছে।
আমায় একটা কথা বলুন, আপনার মেডিটেশন কেন প্রয়োজন হচ্ছে? দিনভর বেপর্দা নারীদের সাথে ঘোরাঘুরি বা মেলামেশা করলে, হারাম জিনিস উপভোগ করলে, নিজের পঞ্চইন্দ্রিয়কে হারাম কাজে লাগিয়ে আপনি কীভাবে আশা করতে পারেন যে, আপনার মনোযোগ উন্নত হবে? আপনার অবচেতন মন উন্নত হবে? আর তখন এই হারামের সাগরে হাবুডুবু খেতে খেতে আপনি মন পরিষ্কার করার জন্য ছুটে যাচ্ছেন শির্ক আর কুফরের রাস্তায়!!!
.
আমরা বলব, ভাই আগে নিজেকে হারাম থেকে দূরে হটান! নিজের নাফসকে দুনিয়াদারির লালসায় লাগিয়ে রেখে আপনি এটা আশা করতে পারেন না যে, আপনি অন্তরে শান্তি পাবেন, আপনার সচেতন আর অবচেতন মন উন্নত হবে! আপনার কনফিডেন্স লেভেল বাড়বে! বরং নিজেকে হারাম থেকে, দুনিয়ার মোহ থেকে সরিয়ে আল্লাহর পথে নিজেকে সঁপে দিন; দেখবেন কীভাবে নিজের বুঝে ওঠার আগেই আপনার দেহ, মন পবিত্র ও বিশুদ্ধ হয়ে গেছে! কীভাবে আপনার জীবনের মোড় বদলে গেছে! কীভাবে আপনার আত্মপ্রত্যয় বৃদ্ধি পাচ্ছে - যা আপনি কল্পনাও করতে পারবেন না!
.
কেননা এটা আল্লাহর রহমত যে, প্রকৃত মুমিন, যে আল্লাহর স্মরণে নিজেকে সঁপে দেয়, আল্লাহ তাআলা তার অন্তরকে প্রশান্তিতে ভরিয়ে দেন!!! সুবহানআল্লাহ!
.
ٱلَّذِينَ ءَامَنُوا۟ وَتَطْمَئِنُّ قُلُوبُهُم بِذِكْرِ ٱللَّهِۗ أَلَا بِذِكْرِ ٱللَّهِ تَطْمَئِنُّ ٱلْقُلُوبُ
.
"যারা ঈমান আনে এবং আল্লাহর স্মরণে যাদের চিত্ত প্রশান্ত হয়; জেনে রেখ, আল্লাহর স্মরণেই চিত্ত প্রশান্ত হয়।"[৩]
.
.
إِنَّ ٱلَّذِينَ قَالُوا۟ رَبُّنَا ٱللَّهُ ثُمَّ ٱسْتَقَٰمُوا۟ تَتَنَزَّلُ عَلَيْهِمُ ٱلْمَلَٰٓئِكَةُ أَلَّا تَخَافُوا۟ وَلَا تَحْزَنُوا۟ وَأَبْشِرُوا۟ بِٱلْجَنَّةِ ٱلَّتِى كُنتُمْ تُوعَدُونَ
.
"যারা বলে - আমাদের প্রতিপালক আল্লাহ, অতঃপর (সে কথার উপর) সুদৃঢ় থাকে, ফেরেশতারা তাদের নিকট অবতীর্ণ হয় আর বলে, 'তোমরা ভয় করো না, চিন্তা করো না, আর জান্নাতের সুসংবাদ গ্রহণ কর যার ওয়া‘দা তোমাদেরকে দেওয়া হয়েছে'।"[৪]
.
.
পক্ষান্তরে ইসলামের সত্য প্রত্যাখানকারীদের দুনিয়াপ্রীতি, শির্ক আর কুফরির কারণে শয়তান তাদের বন্ধু হয়ে মন্দ কর্ম ও পথভ্রষ্টতাকে তাদের নিকট সুশোভনীয় করে তোলে!!
.
أَلَمْ تَرَ أَنَّآ أَرْسَلْنَا ٱلشَّيَٰطِينَ عَلَى ٱلْكَٰفِرِينَ تَؤُزُّهُمْ أَزًّا
.
"তুমি কি লক্ষ্য করো না যে, আমি সত্য প্রত্যাখানকারীদের জন্য শয়তানদেরকে ছেড়ে রেখেছি তাদেরকে মন্দ কর্মে বিশেষভাবে প্রলুব্ধ করার জন্য?"[৫]
.
.
أَفَمَن زُيِّنَ لَهُۥ سُوٓءُ عَمَلِهِۦ فَرَءَاهُ حَسَنًاۖ فَإِنَّ ٱللَّهَ يُضِلُّ مَن يَشَآءُ وَيَهْدِى مَن يَشَآءُۖ فَلَا تَذْهَبْ نَفْسُكَ عَلَيْهِمْ حَسَرَٰتٍۚ إِنَّ ٱللَّهَ عَلِيمٌۢ بِمَا يَصْنَعُونَ
.
"যাকে তার মন্দ কর্ম শোভনীয় করে দেখানো হয়, অতঃপর সে সেটাকে উত্তম মনে করে (সে কি তার সমান, যে সৎ পথে পরিচালিত?) আল্লাহ যাকে ইচ্ছে বিপথগামী করেন, আর যাকে ইচ্ছে সঠিক পথে পরিচালিত করেন। কাজেই তাদের জন্য আক্ষেপ করে, তুমি তোমার জীবনকে ধ্বংস হতে দিও না। তারা যা করে আল্লাহ তা খুব ভালভাবেই জানেন।"[৬]
.
.
আরও একটি ধারণা আছে যে, মেডিটেশনে স্মৃতিশক্তি বৃদ্ধি পায়। এখানে লক্ষ্যণীয় বিষয় হল, মেডিটেশনে কোনো একটি বিষয়ের ওপর চিন্তাকে স্থির করা হয় এবং তাতে মনোযোগ দেওয়া হয় বিধায় পার্থিব ভোগ-বিলাসিতা থেকে মনকে কিছু সময়ের জন্য সরিয়ে আনা হয়। মনোযোগকে স্থির করা হয় বিধায় এক্ষেত্রে কোনো বিষয়বস্তু শেখা বা জানার ক্ষেত্রে সেই বিষয়টি ইন্দ্রিয়ের মাধ্যমে মস্তিষ্কে গ্রহণ করতে এবং তা স্মরণ করতেও সুবিধা হয়। উদাহরণ হিসেবে, কেউ যদি পর্নগ্রাফি দেখে এসে কোনো বই পড়তে বসে, আর অন্য একজন এই হারাম বিষয় উপভোগ থেকে দূরে থাকে এবং ভাল মেজাজ নিয়েই ঠাণ্ডা মাথায় পড়তে বসে, তাহলে এটা খুবই সাধারণ ব্যাপার যে, পর্নগ্রাফি দেখা ব্যক্তির মনোযোগ এর চেয়ে, যে ব্যক্তি পর্নগ্রাফি না দেখে পড়তে বসেছে, তার মনোযোগ এবং বই এর বিষয়বস্তু আয়ত্ত করার সক্ষমতাও বেশি হবে!
.
এখানে মূল বিষয় হল মস্তিষ্ক এবং চিন্তাশক্তিকে সঠিকভাবে কাজে লাগানো!
তবে মস্তিষ্ক এবং চিন্তাশক্তিকে সঠিকভাবে কাজে লাগালেই যে আপনার স্মৃতি বেড়ে যাবে, এটা ভাবাও পুরোপুরি সঠিক নয়।
কারণ আল্লাহ তাআলাই যাকে ইচ্ছা স্মৃতিশক্তি, দক্ষতা দান করেন। আপনি মেডিটেশন এর ক্ষেত্রে স্বামী বিবেকানন্দের স্মৃতিশক্তির প্রশংসা ইন্টারনেটের বিভিন্ন জায়গায় দেখতে পাবেন! কিন্তু এটা কি সত্য নয় যে, স্মৃতিশক্তির ব্যাপারে ডাঃ জাকির নায়েকও কিছু কম যান না? এমনকি সারা পৃথিবী জুড়ে অসংখ্য হাফেজ আছেন, যারা সমগ্র কোরআন এর প্রতিটি শব্দকে হুবহু অন্তরে ধারণ করে রেখেছেন! তারা কোন্ কালে মেডিটেশন করেছেন???
.
তাই যদি আল্লাহ চান, তবেই আপনি স্মৃতিশক্তি, জ্ঞান, দক্ষতা ইত্যাদি পাবেন, নয়ত কিছুই পাবেন না। কাফিররা আল্লাহকেই বিশ্বাস করে না, তাই নিজেদেরই সর্বেসর্বা মনে করে কুফরি করে!
.
মহান আল্লাহ বলেন,
.
"...কে সে, যে তাঁর নিকট সুপারিশ করবে তাঁর অনুমতি ছাড়া? তিনি জানেন যা আছে তাদের সামনে এবং যা আছে তাদের পেছনে। আর তারা তাঁর জ্ঞানের সামান্য পরিমাণও আয়ত্ব করতে পারে না, তবে তিনি যা চান তা ছাড়া..."[৭]
.
.
তাই মেডিটেশনের মত শির্ক আর কুফরের পথে গিয়ে ইবাদত থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়ে দুনিয়াবি কিছু ফায়দা হয়ত আপনি পেতে পারেন; কিন্তু যে জিনিস থেকে আপনি বঞ্চিত হবেন, সেটা হল আল্লাহর রহমত ও ইসলামের সত্য সম্বলিত পথ - যেটি ব্যতীত একজন মুমিন এর অস্তিত্বই অর্থহীন!!!
.
একজন মুমিন ঘুম থেকে উঠে পুনরায় রাতে ঘুমাতে যাওয়ার আগ পর্যন্ত ইবাদতের মধ্যে থাকবে - এটাই ইসলামের শিক্ষা!
.
প্রতিটি সেকেন্ডই ইবাদত! এখানে মনের চেতন, অবচেতন সকল ক্ষেত্রেই মুমিনের অন্তরে থাকবে বিশুদ্ধি, প্রশান্তি!
.
তাই মেডিটেশন এর মত শির্ক ও কুফরের এর রাস্তায় না গিয়ে ইবাদতের পথে চলুন।[৮] সালাতের মাধ্যমে দেহ ও মন বিশুদ্ধ করুন। মনোযোগের জন্য সালাতের প্রতিটি অংশের সূরা এর অর্থ ও ব্যাখ্যাগুলো ভালভাবে আয়ত্ত্ব করুন। হারাম পথ ও দুনিয়াবি লালসা হতে দূরে সরে আসুন।
.
আর বিশেষভাবে অভ্যাস করুন দুয়া ও যিকিরের। মেডিটেশন এর চেয়ে শুদ্ধ চিত্তের এবং উত্তম নিয়তের দুয়া ও যিকির এর প্রভাব অভাবনীয়।
.
ডঃ খন্দকার আব্দুল্লাহ জাহাঙ্গীর (রহঃ) মেডিটেশন বা ধ্যান এর জবাব দেওয়ার সময় বিশেষভাবে দুয়া ও যিকিরের প্রতি গুরুত্ব আরোপ করেছেন। তিনি বলেনঃ
.
"‘ধ্যান’ (meditation) বলতে বর্তমানে এক ধরনের মিথ্যা কল্পনার মধ্যে নিজেকে ব্যস্ত রাখা বুঝানো হয়। এরূপ মিথ্যা কল্পনার মধ্যে ডুবে থেকে কিছু সময়ের জন্য নিজের মনকে বাস্তব দুশ্চিন্তা, হতাশা ইত্যাদি থেকে বিমুক্ত রাখা হয়। আত্ম-উন্নয়ন, মনোসংযোগ বৃদ্ধি, হতাশা-মুক্তি ইত্যাদির জন্য এ পদ্ধতি ব্যবহার করা হয়। এক্ষেত্রে নিম্নের বিষয়গুলো লক্ষণীয়:
.
(ক) এরূপ মিথ্যা কল্পনায় নিমগ্ন থাকাকে ইসলামী তাফাক্কুর অথবা ‘মুরাকাবা’ বলে আখ্যায়িত করা ইসলামের নামে মিথ্যাচার।
.
(খ) আত্মউন্নয়ন, মনোসংযোগ এবং দুশ্চিন্তা-হতাশা থেকে মুক্তির জন্য আল্লাহর যিকর ও দুআ অনেক বেশি কার্যকর। জোর করে মনকে মিথ্যা কল্পনায় নিমগ্ন না রেখে যথাসম্ভব মনোযোগ সহকারে সামান্য সময় আল্লাহর যিকর ও দুআ করলে অনেক বেশি জাগতিক-মানসিক ফল পাওয়া যায়। পাশাপাশি সাওয়াব ও আত্মিক উন্নতি তো অপরিসীম।"[৯]
.
.
মহান আল্লাহ আমাদের হেদায়েতের পথে অটল রাখুন এবং শির্ক-কুফর-বিদআতমুক্ত সহিহ ইসলামের ওপর মৃত্যুবরণের তৌফিক দান করুন। আমিন।
.
.
_________________________
References:
[১] ভগবতগীতা, ৪:৩৫
[২] তিরমিযী ২১৮০, মুসনাদ আহমাদ ৫/২১৮ সানাদ সহীহ;
source - http://www.hadithbd.com/share.php?hid=65880
[৩] আল-কোরআন, ১৩:২৮
[৪] আল-কোরআন, ৪১:৩০
[৫] আল-কোরআন, ১৯:৮৩
[৬] আল-কোরআন, ৩৫:৮
[৭] আল-কোরআন, ২:২৫৫
[৮] অনেকে দাবি করতে পারে, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম নবুয়তের আগে হেরা পাহাড়ের গুহাতে ধ্যানমগ্ন ছিলেন, তাই ধ্যান ইসলামেও অনুমোদিত!
আমার প্রশ্ন হল, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম নবুয়তের আগে হেরা পাহাড়ের গুহাতে ধ্যানমগ্ন হয়েছিলেন, নবুয়তের পরে কি ধ্যানে বসেছিলেন? ইসলাম যখন পরিপূর্ণ রূপে প্রতিষ্ঠিত হয়নি, তখনকার হিসেবে পরিপূর্ণ ইসলামকে বিচার করলে তা হবে মূর্খতার পরিচয়!
আল্লাহ তাআলা বলছেন,
"...আজ আমি তোমাদের জন্য তোমাদের দ্বীনকে পূর্ণাঙ্গ করে দিলাম, তোমাদের প্রতি আমার নিআমাত পূর্ণ করে দিলাম এবং ইসলামকে তোমাদের দ্বীন হিসেবে কবূল করে নিলাম.."
(আল-কোরআন ৫:৩)
অর্থাৎ ইসলাম পরিপূর্ণ আর তাই ইসলামে যোগ বা বাদ দেওয়ার কিছু নেই। যে কেউ ইবাদতে নতুন কিছু যোগ করবে, সে বিদআত চালু করবে আর দেখুন রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কী বলছেনঃ
গ্রন্থঃ সহীহ মুসলিম (ইফাঃ)
অধ্যায়ঃ ৮/ জুমু’আ (كتاب الجمعة)
হাদিস নম্বরঃ ১৮৭৮
১৮৭৮। হাম্মাদ ইবনুল মূসান্না (রহঃ) ... জাবির ইবনু আবদুল্লাহ (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যখন খুতবা দিতেন তখন তার চক্ষুদ্বয় রক্তিম বর্ণ হত, স্বর উঁচু হত এবং কঠোর রাগ প্রকাশ পেত। মনে হত তিনি যেন আক্রমণকারী বাহিনী সম্পর্কে সতর্ক করেছেন, বলছেন, তারা তোমাদের সকালে আক্রমণ করবে এবং বিকেলে আক্রমণ করবে। তিনি বলতেন, আমি প্রেরিত হয়েছি এমন অবস্থায় যে, আমি ও কিয়ামত এ দুটির ন্যায় এবং মধ্যম অংগুলী ও শাহাদাত অংগুলী মিলিয়ে দেখাতেন। বলতেন, উত্তম বাণী হল আল্লাহ তা'আলার কিতাব এবং সর্বোত্তম হিদায়াত হল মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর হিদায়াত।
.
***নিকৃষ্ট বিষয় হলো বিদআত (দ্বীনে নতুন আবিষ্কৃত বিষয়সমূহ।) সকল বিদআতই হল পথভ্রষ্টতা।***
.
এরপর বলতেন, আমি প্রত্যেক মুমিনের জন্য তার প্রাণ হতে অধিক প্রিয়তর। যে মৃত ব্যাক্তি মাল সম্পদ রেখে যায়, তা তার পরিবার পরিজনদের জন্য। আর যে মৃতব্যাক্তি ঝণ অথবা ছোট ছেলেমেয়ে রেখে যায়, তাদের দায়িত্ব আমার উপর।
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih) http://www.hadithbd.com/share.php?hid=11243
হিন্দু দর্শনের মায়াবাদীরা ঠিক এই অযুহাতটাই দেয় যে, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম নবুয়তের সময় আসলে ধ্যানমগ্ন হয়ে নিজের মধ্যে ব্রহ্মের বাণী অনুভব করেছেন আর কোরআন আসলে এই ব্রহ্ম হতে প্রাপ্ত জ্ঞান, আর আগেই বলেছি, এদের দাবি অনুসারে সব কিছু ব্রহ্মের অংশ, আর তাই রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামও আসলে ব্রহ্মের অংশ! নাউযুবিল্লাহ! আর এই ফেরেশতা, জান্নাত, জাহান্নাম সব হল মায়া যা আমাদের ইন্দ্রিয় আমাদের অনুভব করায় মাত্র, কিন্তু এগুলো আসলে মিথ্যা!
এগুলো সুস্পষ্ট কুফরি আকিদা!!!
ভারতের সুফিরা এই বেদান্তবাদীদের দর্শনে প্রভাবিত হয়ে অনেক রকম শির্ক- কুফর যুক্ত আকিদা চালু করেছে যা প্রথম যুগের সুফিদের মধ্যেও হয়ত পাওয়া যাবে না!
কোরআনে আল্লাহ তাআলা স্পষ্ট ঘোষণা করে দিয়েছেন যে, এই কোরআন আল্লাহর কালাম, এটা ধ্যান লব্ধ অতিন্দ্রিয়বাদীর কোনো কথা নয়!!!
فَلَآ أُقْسِمُ بِمَا تُبْصِرُونَ
وَمَا لَا تُبْصِرُونَ
إِنَّهُۥ لَقَوْلُ رَسُولٍ كَرِيمٍ
وَمَا هُوَ بِقَوْلِ شَاعِرٍۚ قَلِيلًا مَّا تُؤْمِنُونَ
وَلَا بِقَوْلِ كَاهِنٍۚ قَلِيلًا مَّا تَذَكَّرُونَ
تَنزِيلٌ مِّن رَّبِّ ٱلْعَٰلَمِينَ
"তোমরা যা দেখ, আমি তার শপথ করছি এবং যা তোমরা দেখ না, তার-
নিশ্চয়ই এই কোরআন একজন সম্মানিত রাসূলের আনীত এবং এটা কোন কবির কালাম নয়; তোমরা কমই বিশ্বাস কর
এবং ***এটা কোন অতীন্দ্রিয়বাদীর কথা নয়; তোমরা কমই অনুধাবন কর।***
এটা বিশ্বপালনকর্তার কাছ থেকে অবতীর্ণ।"
(আল-কোরআন, ৬৯:৩৮-৪৩)
.
.
আমার লেখার শেষের দিকে ডঃ খন্দকার আব্দুল্লাহ জাহাঙ্গীর এর মতামতটি পড়ুন। উনি "ধ্যান" শব্দটাকে ইসলামিক ভাবে গ্রহণ করেন নি। এক্ষেত্রে কোরআন এবং হাদিসের ওপর মনোযোগকে ধ্যান বলে না, ধ্যান শব্দটা হিন্দু দর্শনের শব্দ, একইভাবে অনেকে বলে মায়া মমতা। মায়া শব্দটাও হিন্দু শব্দ, এটার সাথে মমতার পার্থক্য আছে। ব্যাপারটা পানি আর জলের মত না। পানিকে জল বলতে কোনো সমস্যা নেই। দুটো একই জিনিস। কিন্তু আল্লাহ আর ভগবান এক অস্তিত্ব নয়। ঈশ্বর শব্দটা কাছাকাছি যায়, কিন্তু এর মধ্যেও মুশরিকি বিষয় ঢুকানো হয়েছে।
অনেকে দাবি করতে পারে যে, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম নবুয়তের পূর্বে ধ্যানের মাধ্যমে শির্ক এবং কুফরি করেছেন (নাউযুবিল্লাহ), বরং কখনই তিনি তা করেন নি। হাদিসের বাংলা অনুবাদে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর হেরা পাহাড়ে মনোযোগকে ধ্যান বলে বর্ণনা করা হয়েছে মাত্র। কিন্তু হিন্দু দর্শনের সিস্টেমে ধ্যান করার নিয়তে তিনি কিছু করেন নি। বরং তিনি ইবাদতের সঠিক পদ্ধতি জানতেন না, তাই হয়ত নিজের মত মনোযোগের চেষ্টা করছিলেন মাত্র (আল্লাহই ভালো জানেন)। আল্লাহ তাআলাই নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে জিব্রীল আলাইহিস সালাম এর মাধ্যমে শিক্ষা দিয়েছেন।
আল্লাহ বলেন,
وَكَذَٰلِكَ أَوْحَيْنَآ إِلَيْكَ رُوحًا مِّنْ أَمْرِنَاۚ مَا كُنتَ تَدْرِى مَا ٱلْكِتَٰبُ وَلَا ٱلْإِيمَٰنُ وَلَٰكِن جَعَلْنَٰهُ نُورًا نَّهْدِى بِهِۦ مَن نَّشَآءُ مِنْ عِبَادِنَاۚ وَإِنَّكَ لَتَهْدِىٓ إِلَىٰ صِرَٰطٍ مُّسْتَقِيمٍ
"এভাবে আমি তোমার প্রতি প্রত্যাদেশ করেছি রূহ তথা আমার নির্দেশ; (হে মুহাম্মাদ) তুমি তো জানতে না কিতাব কি ও ঈমান কি! পক্ষান্তরে আমি একে করেছি আলো যা দ্বারা আমি আমার বান্দাদের মধ্যে যাকে ইচ্ছা পথ-নির্দেশ করি; তুমিতো প্রদর্শন কর শুধু সরল পথ"
(আল-কোরআন, সূরা আশ-শুরা ৪২:৫২)
.
.
(কোনোরূপ ভুল-ত্রুটির জন্য আল্লাহ মার্জনা করুন)।
[৯] গ্রন্থঃ হাদীসের নামে জালিয়াতি
অধ্যায়ঃ বেলায়াত, আওলিয়া ও ইলম বিষয়ক/চিন্তা-ফিক্র, মুরাকাবা ও ধ্যান;
source - http://www.hadithbd.com/shareqa.php?qa=4907
==================================
- Ahmed Ali
Comments
Post a Comment